ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে সংঘর্ষ চলছে, দুই সাংবাদিকসহ আহত ছয়
২ আগস্ট, ২০১২ ২:২২ অপরাহ্ণ
-

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও পুলিশের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া চলছে।

এসময় ওই মহাসড়ক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সংঘর্ষে দুই ছাত্র আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

সংঘর্ষ চলাকালে মিডিয়ার কর্মীরা ছবি তুলতে গেলে পুলিশের লাঠিচার্জে দুই সংবাদিক আহত হন।

বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক থেকে ছাত্রদের সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলে ছাত্রদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়।

এদিকে জাবির ছাত্ররা ৮ দফা দাবি দিয়েছে। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে বুধবার রাতে পুলিশের গুলির দায়ভার ভিসিকে নিতে হবে, প্রক্টরিয়াল বডির পদত্যাগ, ছাত্রদের ওপর গুলি করা পুলিশ সদস্যদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং জাকসু নির্বাচন উল্লেখযোগ্য।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু হলের ছাত্রলীগ নেতা তাহমিদুল ইসলাম লিখনকে কুপিয়ে আহত করার অভিযোগে আরেক ছাত্র নাহিদকে আটক করাকে কেন্দ্র করে রাতভর পুলিশের সঙ্গে ছাত্রদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বুধবার মধ্যরাত থেকে ক্যাম্পাস সংলগ্ন ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে রেখেছে। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছে ওই সড়ক ব্যবহারকারী যাত্রীরা।

এর আগে জাবি ভিসি অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেনের নির্দেশে পুলিশের গুলিতে পাঁচ শিক্ষার্থী আহত হওয়ার পরিপেক্ষিতে রাতভর তাণ্ডব চালায় শিক্ষার্থীরা। ঘটনার পর ভিসি আনোয়ার হোসেন ঢাকায় পালিয়ে গেছেন। অপরদিকে গুলিতে আহত শিক্ষার্থীদের সাভার এনাম মেডিকেলে ভর্তি করা হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার অধ্যাপক আবু বকর প্রশাসনের পক্ষ থেকে গুলি করার অভিযোগ অসস্বীকার করেছেন।

জানা যায়, রাত সাড়ে দশটার সময় ছাত্রলীগ নেতা তাহমিদুল ইসলাম লিখনকে কুপিয়ে জখম করার সন্দেহে রাত ১২টার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মোশারফ হোসেন হলে ঢুকে নাহিদ (নৃ-বিজ্ঞান, ৩৯ ব্যাচ)  নামে এক শিক্ষার্থীকে আটক করে পুলিশ।

বিনা ওয়ারেন্টে আটক করার প্রতিবাদ করলে পুলিশ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করে। এতে শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ হয়ে পুলিশের নিকট থেকে নাহিদকে জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয় এবং প্রভোস্টের বিরুদ্ধে মিছিল দিতে দিতে তার বাংলোর দিকে গেলে মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়।

এতে  রাকিব নামে একটি অনলাইন পত্রিকার সাংবাদিকসহ  বশির, নাহিদ মারুফ ও রবিন নামের পাঁচজন গুলিবিদ্ধ হন। পুলিশের গুলি করার খবর ছড়িয়ে পড়লে ঢল নামে শিক্ষার্থীদের। প্রায় দেড় সহস্রাধিক শিক্ষার্থী হলের সামনে গিয়ে পুলিশ ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে মিছিল দিতে থাকে।

এসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন সেখানে হাসি মুখে উপস্থিত হলে শিক্ষার্থীরা আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে ও শিক্ষার্থীদের ওপর কেন গুলি করা হয়েছে জানতে চাইলে অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন তির্যকভাবে জবাব দেন। আসামি ছিনিয়ে নিয়ে অন্যায় করেছো, পুলিশতো গুলি করবেই। এ কথার পরিপেক্ষিতে শুরু হয়ে যায় শিক্ষার্থীদের তাণ্ডবলীলা।

অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজের সঙ্গে অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনকে ধাক্কা দিয়ে হল থেকে বের করে দেয় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। শত শত শিক্ষার্থী ঝাঁপিয়ে পরে ভিসি ও পুলিশের দুটি গাড়ির ওপর। গাড়ি তিনটিতে ভাংচুর চালানোর পর ঢাকা আরিচা মহাসড়েকে এসে অবস্থান নেয় এবং মীর মোশারফ হোসেন হল গেটের সন্নিকটে হাইওয়ের গাড়ি ভাংচুর করতে থাকে।

এসময় সহকারী প্রক্টরদের নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গাড়ি সেখানে উপস্থিত হলে শিক্ষার্থীরা সেটিও ভাঙচুর করে।

এর আগে মীর মোশারফ হোসেন হলের প্রভোস্ট সেখানে উপস্থিত হলে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা তাকে লাঞ্ছিত করে বলেও জানা গেছে।

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সহকারী প্রক্টরদের পাহারায় তাৎক্ষণিক ভাবে উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন ভাঙ্গা গাড়িতে করেই ঢাকায় চলে যান।

এদিকে উপাচার্যকে লাঞ্ছিত এবং তার গাড়ি ভাঙচুর করার বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, “ড.শামছুজ্জোহা ছাত্রদের জন্য নিজের বুক পেতে দিয়ে ছিলেন আর টিক্কা খান ( অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন) ছাত্রদের ওপর গুলি করার নির্দেশ দেন। আমরা তাকে ঘৃণা করি। তিনি শিক্ষকদের কলঙ্ক।”

এ বিষয়ে অপর এক শিক্ষার্থী বলেন, জাবির ইতিহাসে এই প্রথম শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি করার ঘটনা ঘটল। উনি এখানে আমাদের অভিভাবক হতে আসেননি। এসেছেন ওনার রক্তে বন্দুকের নল আছে তা বোঝাতে।

এদিকে অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন পালিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে সহকারী প্রক্টরের দল, শিক্ষক ও পুলিশের সকল সদস্য শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও ইটপাটকেলের মুখে পালিয়ে যায়।

পুলিশ ও শিক্ষকেরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করার পরই হলের শিক্ষার্থীরা এক যোগে রড, লাঠি, পাইপ ইত্যাদি নিয়ে মিছিল করে দুই ভাগে ভাগ হয়ে একটি অংশ ঢাকা আরিচা মহাসড়কে এসে শতাধিক গাড়ি ভাঙচুর করে। অপর একটি অংশ একে একে টিএসসি, জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটার (টিএসসি), সাংবাদিক সমিতি, প্রক্টর অফিস, ধ্বনি, জলসিড়ি, ভাষা শিক্ষা কেন্দ্র, জহির রায়হান মিলনায়তন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক, প্রশাসনিক ভবন (নতুন), প্রশাসনিক ভবন (পুরাতন), ডেপুটি রেজিস্টারের (শিক্ষা) অফিসে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়।

ভাঙচুর শেষে সকল শিক্ষার্থীরা একযোগে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে।  এদিকে এখন পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা অবরোধ তুলে না নেয়ায় গত রাত সাড়ে ১২টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।

এদিকে বৃহস্পতিবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি অধ্যাপক ফরহাদ হোসেন, ট্রেজারার নাসির উদ্দিন এবং প্রক্টর অধ্যাপক ড. তপন কুমার সাহা ঘটনাস্থলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের বোঝানোর চেষ্টা করলে তা কোনো কাজে আসেনি বরং রাতে শিক্ষার্থীদের খোঁজ না নিয়ে সকালে উদয় হওয়ায় আরো ক্ষেপে যায় শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে সরে আসতে বাধ্য হন তারা। এর পরপরই আবার মিছিল নিয়ে একদল শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে পুরাতন কলা ভবন ও অন্যান্য ভবনে ব্যাপক ভাঙচুর করে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টারকে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক তপন কুমার সাহার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বার্তা২৪ ডটনেটকে বলেন, “ঘটনাটি সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত। আমরা বারবার চেষ্টা করছি শিক্ষার্থীদের থামাতে। কিন্তু কোনো কিছুই কাজে আসছে না। তবে আশা করছি খুব তাড়াতাড়িই সমস্যার সমাধান হবে।”

রির্পোট লেখা পর্যন্ত ক্যাম্পাসে প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল চলছে। এ বিষয়ে বিক্ষোভকারী একজন শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “পুলিশকে গুলি করার অনুমতি দিয়ে সামরিক-স্বৈরতান্ত্রিক শাসন চালু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং সার্বভৌমকে  অস্বীকার করার  চেষ্টা করা হয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০ বছরের ইতিহাস ভূলুন্ঠিত করা হয়েছে, অতএব যে পুলিশকে গুলি করার অনুমতি দিয়েছে  তার কঠোর বিচার করতে হবে।”

তবে পুলিশের গুলি করার বিষয়ে প্রক্টর অধ্যাপক তপন কুমার সাহা বলেন, গুলি করার অনুমতি কে দিয়েছে তা আমি বলতে পারি না। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি করাটা নিঃসন্দেহে মারাক্তক ভুল।

তবে গুলি করার বিষয়টি অস্বীকার করার বিষয়ে শিক্ষার্থীদের একজন বার্তা ২৪ ডটনেটকে জানান প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে গুলি করা হয় এটা বললেই আমরা বিশ্বাস করি না। আর পুলিশ যদি প্রশাসনে অনুমতি ছাড়া গুলিই করে তবে তারা কি করেছে , তাদের ক্ষমতায় বসে থাকার কি প্রয়োজন ? পদত্যাগ করলেই পারে।

অন্যদিকে পুলিশের গুলিতে আহত হওয়া পাঁচজনকে সাভার এনাম মেডিকেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চোখের কোণে গুলি লাগা  ব্যতীত বাকি চারজনের অবস্থা আশঙ্কামুক্ত বলে জানা গেছে।

এছাড়া রাতে অজ্ঞাত সন্ত্রাসী হামলায় আহত ছাত্রলীগ নেতা তাহমিদুল হক লিখনের অবস্থাও আশঙ্কামুক্ত বলে জানা গেছে।

পাঠকের মন্তব্য