কাস্টমস কর্মকর্তাদের ২৪ কোটি টাকা ফাঁকি
২ আগস্ট, ২০১২ ৩:২৭ অপরাহ্ণ
-

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের চিহ্নিত কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই বন্দর দিয়ে অবৈধ পণ্যের চালান খালাস হচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এরই মধ্যে এরকম বেশ কয়েকটি পণ্যের চালান খালাসের সঙ্গে কাস্টমসের কর্মকর্তারা জড়িত থাকার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে।


সূত্র জানায়, সম্প্রতি চিহ্নিত ৪০ জন কাস্টমস কর্মকর্তার যোগসাজশে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানিকৃত শতকোটি টাকার পণ্য খালাসের তথ্য পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) উচ্চ পর্যায়ের গঠিত তদন্ত কমিটি। তদন্ত শেষে গঠিত তদন্ত কমিটি এ সংক্রান্ত রিপোর্ট এনবিআরে জমা দিয়েছে। চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের গায়েব হয়ে যাওয়া ১৭১টি আমদানি চালানের নথিপত্র পর্যালোচনা করে প্রায় ২৪ কোটি শুল্ক ফাঁকির বিষয়েও তদন্ত কমিটি তথ্য ও উপাত্ত পেয়েছে।


তদন্ত প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৬ মাসের সন্দেহভাজন ১৭১ টি ফাইল যাচাই-বাছাই করে শুল্ক ফাঁকির পরিমাণ নির্ধারণ ও জড়িতদের চিহ্নিত করতে আদালত নির্দেশনা দেন। উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সুলতান মোহাম্মদ ইকবালকে প্রধান করে ছয় সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে এনবিআর।


প্রায় পাঁচ মাস তদন্ত শেষে গত ২৪ জুন এনবিআরে এ সংক্রান্ত রিপোর্ট জমা দেন। তদন্ত কমিটি সন্দেহভাজন ১৭১টি চালানের মধ্যে যে কয়টি নথি পাওয়া গেছে, তাতে সরকার ২৩ কোটি ৮৩ লাখ ৯ হাজার টাকার শুল্ক থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে তদন্ত রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে।


তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, ওই সময় শুল্ক ফাঁকি দিয়ে শতকোটি টাকার পণ্য ছাড়িয়ে নিতে সংশ্লিষ্টরা সাতটি ভিন্ন ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে।এদিকে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে গত ১০ জুলাই মিথ্যা ঘোষণায় আনা ফটোকপিয়ার মেশিনের একটি চালান খালাসের সঙ্গে সরাসরি কাস্টমস কর্মকর্তারা। এ চালানটি খালাস নেওয়ার সময় তা আটক করে বন্দরের নিরাপত্তা বিভাগ।


নিরাপত্তা বিভাগের কর্মকর্তারা  জানান, চালানটি খালাস নেওয়ার জন্য কাস্টমস কর্মকর্তারা সব ধরণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছিল। ওই চালানের তথ্য যাচাই করে এটি খালাসে কাস্টমস কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে তারা।


জব্দ করা চালানের নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ঢাকার ৯৪, লুৎফর রহমান লেন এলাকার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ইভিই ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ১৩০ ইউনিট ডিজেল জেনারেটর আমদানির ঘোষণা দেয়। চালানটি খালাস নিতে আমদানিকারকের সংশ্লিষ্ট সিএন্ডএফ এজেন্ট এ্যাসেসম্যান্ট করার পরদিন কাস্টমস কর্তৃপক্ষ চালানটি রিলিজ অর্ডার (৭৮০৪৪) দেয়।


৭ জুলাই কাস্টমস কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে গেইট যাচাই সম্পন্ন করার পর খালাস প্রক্রিয়া শেষ হয়। কাস্টমস কর্মকর্তাদের সব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ায় পণ্যের চালানটি (বিলএবএন্ট্রি নম্বর-সি-৭৫৭৭৪) খালাসের অপেক্ষায় ছিল। এ অবস্থায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ৯ জুলাই বন্দরের সিসিটি ইয়ার্ডে পণ্যবাহী কন্টেইনারটি আটক করে বন্দরের নিরাপত্তা বিভাগ।


এরপর সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ১০ জুলাই কন্টেইনারটি খোলা হলে সেখানে ডিজেল জেনারেটরের পরিবর্তে বিভিন্ন আকারের ১৬২টি আমদানি নিষিদ্ধ ফটোকপিয়ার মেশিন পাওয়া যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিরাপত্তা বিভাগের এক কর্মকর্তা বাংলানিউজকে বলেন, অবৈধ পণ্যের চালানটি কাস্টমসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগের যোগসাজশে খালাস প্রক্রিয়া হয়েছে।


তবে বন্দরের নিরাপত্তা বিভাগের কর্মকর্তাদের এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা ওমর ফারুক।


অভিযুক্তরা হচ্ছেন রাজস্ব কর্মকর্তা সাইফুর রহমান, শফিউল আলম, সফিউল আলম, হুমায়ুন কবির, পিবি পাল, সৈয়দ হুমায়ুন আখতার, হাফিজুর রহমান, মীর আবদুল হালিম, মো. হারুন অর রহমান, একেএম সালেহ্ আহমেদ চৌধুরী, নিজামুল হক, এএসএম মহসিন ও হাসান মনসুর। সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ফরিদউদ্দিন, শাহিদা লায়লা, মুজিবুর রহমান, হাফিজুর রহমান, সাজিব বিকাশ বড়ূয়া, নুরুল আলম সিকদার, মুন্সী আখতার হোসেন, আখতার হোসেন, শওকত আনোয়ার চৌধুরী, বন্দনা দাস, মিজানুর রহমান, সুরাইয়া খানম, রহিমা খাতুন, মবিন উল ইসলাম খসরু, মনছুরুল হাসান, কাউছার মাহমুদ, আছাদুল করিম নাসির, জসিম উদ্দিন মজুমদার, খায়রুল এনাম, আবদুল্লাহেল কাফি, শ্যামল কান্তি মজুমদার, একেএম খুরশীদ হোসেন, সালাহউদ্দিন তালুকদার, নাজিমউদ্দিন আহমেদ, একেএম ফজলুল হক, সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া এবং শিরীন সুলতানা।


এদের মধ্যে অনেকেই এখন দেশের বিভিন্ন স্থানে কর্মরত আছেন। এছাড়া তদন্তে অভিযুক্ত ১৭১টি পণ্য চালান খালাসের সঙ্গে সরাসরি জড়িত এমন সিএন্ডএফ এজেন্ট প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৩টি। এরমধ্যে মেসার্স কিং শিপ শিপিং এজেন্সিস সর্বোচ্চ ৫৬ টি আমদানি চালানে (বিল অব এন্ট্রি) জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত। মেসার্স নিপা ট্রেডিং প্রাইভেট লিমিটেড ৩৮ টি বিল অব এন্ট্রি জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত। মেসার্স এম আর কর্পোরেশন ৩৫টি বিল অব এন্ট্রি জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত এবং ৩২টি বিল অব এন্ট্রি জালিয়াতির সঙ্গে মেসার্স এম সি শিপিং এজেন্সিস জড়িত।

 

এ ছাড়াও মেসার্স ইউনাইটেড কার্গো প্রাইভেট লিমিটেড, মেসার্স কর্ণফুলী এজেন্সিস, সানিয়া এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স শরিফ শিপিং লাইন্স প্রাইভেট লিমিটেড, মেসার্স ডে অ্যান্ড নাইট কর্পোরেশন, মেসার্স নিউ লাইট শিপার্স অ্যান্ড ট্রেডার্স, মেসার্স জিক কর্পোরেশন লিমিটেড, মেসার্স সবুজ অ্যান্ড ব্রাদার্স ও মেসার্স সোনালি এন্টারপ্রাইজ একটি করে চালান জালিয়াতি করেছে বলে প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি।


উল্লেখ্য, বর্তমান কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সহায়তায় এসাইকুডা ডাবল প্লাস সিস্টেমে রক্ষিত তথ্য-উপাত্ত এবং সোনালী ব্যাংক কাস্টমস হাউস শাখার সরবরাহ করা এসেসমেন্ট নোটিশের তৃতীয় কপিতে কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর এবং সিলমোহর যাচাই-বাছাই করে ১৭১টি বিল অব এন্ট্রির শুল্কায়ন জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করা হয়েছে।

পাঠকের মন্তব্য